বুধবার , ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:২৫, ৩১ অক্টোবর ২০২৫

জেমিমার অপরাজেয় ব্যাট আর অম্লান প্রতিজ্ঞা; এ সবকিছুর নামই ক্রিকেট!

জেমিমার অপরাজেয় ব্যাট আর অম্লান প্রতিজ্ঞা; এ সবকিছুর নামই ক্রিকেট!

ইনিংস শুরুর মিনিট পাঁচেক আগেও জেমিমা জানতেন না, তাকে তিন নম্বরে ব্যাট করতে হবে। সেই তিনিই বিশ্বকাপ বীরত্বগাঁথা রচনা করে দেশের মাঠে ভারতকে ফাইনালে তুললেন...

জেমিমার ঘামে ভেজা কাঁদামাখা জার্সি, জেমিমার চোখের জল আর মুখের হাসি, জেমিমার অপরাজেয় ব্যাট আর অম্লান প্রতিজ্ঞা ... জেমিমার চোখাধাঁধানো সব কাট শট...

এই সবকিছুর নামই ক্রিকেট...

জেমিমা ইভান রদ্রিগ্‌স আজ ছিলেন ক্রিকেট খেলাটির উজ্জ্বল প্রতীক। আজকে যে জেমিমাকে আমরা দেখেছি, আজকে যে ম্যাচটি আমরা দেখলাম, ঠিক সেসব কারণেই ক্রিকেট আমরা ভালোবাসি। এসব কারণেই ক্রিকেট নামক খেলাটাকে আমরা মনে করি জীবনের প্রতিচ্ছবি... 

ম্যাচটি যারা পুরো দেখেছেন, তারা জানেন, অস্ট্রেলিয়ার গ্রাউন্ড ফিল্ডিং আজকে ছিল দা ন বী য় পর্যায়ের। ফিল্ডিংয়ে তারা বরাবরই শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে। আজকেও গ্রাউন্ড ফিল্ডিং ছিল অতিমানবীয়। তবে এর ফাঁকে ক্যাচিংয়ে মানবীয় কিছু ভুল তারা করেছেন। সেটির চরম খেসারত দিতে হয়েছে। ওই যে, জীবন যে রকম চড়াই-উৎরাইয়ের হয়...!

জেমিমা খুব ভালো নাচতে পারেন। গাইতে পারেন। দুর্দান্ত গিটার বাজান। কিন্তু আজকে ব্যাট হাতে যে ঝংকার তিনি তুলেছেন, এর চেয়ে মোহনীয় কিছু কমই আছে...

গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে তিনি দলে সুযোগ পাননি। এটিই তার প্রথম বিশ্বকাপ। প্রত্যাশা ছিল তার কাছে অনেক। বিশ্বকাপের আগে বেশ ফর্মেও ছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপে এসে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছিলেন না।  প্রথম তিন ম্যাচে দুবার শূন্য রানে আউট হলেন। এক পর্যায়ে একাদশে জায়গা হারালেন। তার জন্য এটি ছিল বড় ধাক্কা...

পরে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে একাদশে ফিরলেন। যেটি ছিল কার্যত কোয়ার্টার-ফাইনাল। তাকে ব্যাটিংয়ে পাঠানো হলো তিন নম্বরে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে আগে মোট তিন দফায় তিনে ব্যাট করে তার মোট রান ছিল ১৩। এবার সাড়ে চার বছর পর তিন নম্বরে নেমে তিনি করলেন ৫৫ বলে অপরাজিত ৭৬...

মেয়েটি দেখতে দারুণ মিষ্টি। শরীর লিকলিকে। সমসাময়িক অন্য অনেকের মতো পেশি তার নেই। বাহুতে অসুরের শক্তি নেই। তার ব্যাটের গ্রিপ আর স্টান্স এমন যে, পাওয়ার ক্রিকেট খেলা তার জন্য কঠিন। কিন্তু তার আছে স্কিল। আছে টাইমিংয়ের সহজাত ক্ষমতা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, মায়াবী চেহারার আড়ালে আছে কঠিন মানসিকতা আর চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা...

কোয়ার্টার-ফাইনালে রূপ নেওয়া ম্যাচে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে যেমন দেখালেন, তেমনি মেলে ধরলেন সেমি-ফাইনালে আজ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও...

২০১৭ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ডার্বি কাউন্টি গ্রাউন্ডে হারমানপ্রিত কৌরের ১১৫ বলে ১৭১ রানের অবিশ্বাস্য এক ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল ভারত। নারী ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ইনিংসগুলোর একটি মনে করা হয় সেটিকে। এরপর বিশ্বকাপে টানা ১৫ ম্যাচ অপরাজেয় ছিল অস্ট্রেলিয়া। গত বিশ্বকাপে তারা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। আগের ১২ বিশ্বকাপের সাতটিতেই তারা চ্যাম্পিয়ন। এবারও কোনো ম্যাচ না হেরে তারা পৌঁছে যায় সেমি-ফাইনালে...
এরপর.... জেমিমা রদ্রিগ্‌স হ্যাপেনড...!!!

শক্তি-সামর্থ্য, পেশাদারিত্ব ও নানা পারিপার্শ্বিকতায় উইমেন'স ওয়ার্ল্ড কাপে অস্ট্রেলিয়ার শিরোপা না জেতাটাই আসলে বড় অঘটন। জেমিমা সেটিতে বাস্তবে রূপ দিলেন...

হ্যাঁ, বিশ্বরেকর্ড রান তাড়ায় হারমানপ্রিতের বড় অবদান ছিল। দিপ্তি শার্মা, রিচা ঘোষের ক্যামিও ইনিংসের ভূমিকা ছিল, যেগুলো প্রত্যাশিতই। কিন্তু দ্বিতীয় ওভারে ক্রিজে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দলের জয় সঙ্গে নিয়ে ফিরে যে ইনিংস জেমিমা খেললেন, এসব আসলে এক জীবনের প্রাপ্তি...

দেশের মাঠের বিশ্বকাপের প্রত্যাশা কিংবা বিশাল রান তাড়ার চাপ, এসব বিবেচনায় হয়তো জেমিমার এই ইনিংস হারমানপ্রিতের সেই ১৭১ রানকেও ছাড়িয়ে গেছে। উপলক্ষের বিশালত্ব বিবেচনায় হয়তো এটি নারী বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা ইনিংস...

অথচ ইনিংস শুরুর মিনিট পাঁচেক আগেও জেমিমা জানতেন না, তাকে তিন নম্বরে ব্যাট করতে হবে। তিনি ভেবেছিলেন, পাঁচ নম্বরে খেলতে হবে। শাওয়ার নিতে চলে গিয়েছিলেন। পরে ফিরে জানতে পারেন ব্যাটিং অর্ডার। মানসিকভাকে ধাতস্থ হওয়ার আগেই নেমে যেতে হয় ক্রিজে। ম্যাচ শেষে আবেগের স্রোতে হাবুডুবু খেয়ে তিনি নিজেই বলেছেন তা। তার ইনিংস, তার কীর্তির মাহাত্মও বেড়ে যাচ্ছে এতে...

৩৩৯ রানের পাহাড় তাড়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন জেমিমারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এ বছর রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়া স্মৃতি মান্ধানা। কিন্তু খুবই আলগা এক বলে আলসে শটে তিনি আউট হয়ে যান স্রেফ ২৪ রানে। এই দিনটিকেই জেমিমা আলিঙ্গন করে নিলেন ইতিহাস গড়ার জন্য...

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের পাঁড় ভক্ত হিসেবে তাদের জয় ছাড়া অন্য কিছু আমি চাইনি। ফিবি লিচফিল্ডের অসাধারণ সেঞ্চুরি, সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচে কিংবদন্তি এলিস পেরির দারুণ ইনিংস, ছেলে-মেয়ে মিলিয়েই সময়ের সেরা অলরাউন্ডার অ্যাশলি গার্ডনারের দুর্দান্ত ব্যটিং... এত কিছুর পর অস্ট্রেলিয়ার জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারিনি। তবে শেষ পর্যন্ত হারমানপ্রিত-জেমিমার আনন্দাশ্রু, স্মৃতি-দিপ্তিদের আবেগের উথাল-পাথাল জোয়ার দেখতে সত্যি বলতে মন্দ লাগেনি। দেশের মাঠের বিশ্বকাপে এমন কিছুর উচ্ছ্বাস আসলে উত্তুঙ্গ...

ইনিংসের এক পর্যায়ে জেমিমাকে দেখা যাচ্ছিল, বিড়বিড় করে কীসব বলছেন। ম্যাচের পর সেটি তিনি খোলাষা করলেন, "শেষের দিকে আমি বাইবেলের বাক্য পড়ছিলাম, কারণ খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম ও শক্তি হারিয়েছিলাম। প্রায় নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিলাম। তবে সেই স্তবকটিতে বলা হয়েছে 'স্রেফ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, ঈশ্বরই তোমার হয়ে লড়াই করবেন' এবং আজকে সেটিই হয়েছে। তিনিই লড়াই করেছেন আমার জন্য..."

সেঞ্চুরির পরও জেমিমা তেমন কোনো উদযাপন করেননি। ম্যাচ জিতিয়ে তবেই আবেগের কাছে সমর্পণ করেছেন নিজেকে। গর্বিত কণ্ঠে বললেন, "আমার অর্ধশতক বা শতকের ব্যাপার এখানে ছিল না। আসল ব্যাপার ছিল ভারতকে জেতানো..."

আহা, দেশমাতৃকার গৌরবময় সন্তান। খেলাধুলায় সবসময় দেশপ্রেম মিশে থাকে না অবশ্যই। তবে কখনও কখনও খেলাধুলাই দেশপ্রেমকে ফুটিয়ে তোলে দারুণভাবে। ম্যাচ শেষে কান্নার দমকে জেমিমার প্রতিটি কথায় যেমন তা ফুটে উঠেছে...

আমাদের কোনো লিটন-হৃদয়-তানজিদ কিংবা নিগার-রাবেয়া-স্বর্ণা কোনো একদিন এমন কিছু বলবেন... সেই অপেক্ষার শেষ কবে, জানি না...

মেয়েদের ক্রিকেট কোন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে, দিনে দিনে কত সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেটির আরেকটি নজির এই ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ। আমি ব্যক্তিগতভাবে বরাবরই মেয়েদের ক্রিকেটের একনিষ্ঠ অনুসারী, সব দলের খেলাই অনেক দেখি। প্রিয় দল হারলেও তাই ম্যাচটি আমার জন্য আনন্দদায়ী...

আশা করি, ফাইনাল ম্যাচটিও স্পর্শ করবে কল্পনার নতুন সীমানা...

লেখক: আরিফুল ইসলাম রনি; স্পোর্টস এডিটর, বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর

সর্বশেষ